আটশ কোটি মানুষের পৃথিবীতে, তোমার সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার সম্ভাবনা ঠিক কতটা?
37-August 21, 2026-6 min read

কোয়ান্টাম ফিজিক্সের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো, খুব ক্ষুদ্র জগতের ঘটনাগুলো আমাদের পরিচিত যুক্তি মেনে চলে না। সেখানে কোনো কণা একই সঙ্গে একাধিক সম্ভাবনার মধ্যে থাকতে পারে। আমরা যতক্ষণ না তাকে দেখি, ততক্ষণ যেন প্রকৃতিও ঠিক করে না সে আসলে কোথায় আছে।
ব্যাপারটা শুনতে অদ্ভুত।
অবশ্য মানুষের জীবনও খুব একটা কম অদ্ভুত নয়।
আমরা প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে এমনভাবে দিন শুরু করি, যেন সবকিছু আগেই ঠিক করা। সকালে ঘুম ভাঙবে। চা বানাব। কাজে যাব। পরিচিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলব। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরব। তারপর আরেকটা দিন শেষ হবে।
কিন্তু এই নিয়মের ভেতরেই হাজারটা অসম্ভব সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।
আজ যে মানুষটার পাশ দিয়ে তুমি কোনো কথা না বলে হেঁটে গেলে, দশ বছর পর হয়তো সেই মানুষটাই তোমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হবে।
যে ট্রেনটা তুমি আজ মিস করলে, হয়তো সেটাই তোমাকে কোনো দুর্ঘটনা থেকে বাঁচিয়ে দিল।
যে চাকরিটা তুমি পাওনি, সেটার কারণেই হয়তো একদিন এমন কোনো শহরে গিয়ে পৌঁছাবে, যেখানে যাওয়ার কথা তোমার জীবনের কোনো পরিকল্পনাতেই ছিল না।
আমরা পরে ঘটনাগুলোকে গল্প বানিয়ে ফেলি।
বলি,
“এটাই হওয়ার ছিল।”
অথচ হওয়ার আগে কিছুই এত নিশ্চিত ছিল না।
হাজারটা সম্ভাবনার মধ্যে একটা শুধু সত্যি হয়েছিল।
আর বাকি সম্ভাবনাগুলো?
কে জানে।
হয়তো তারা কোথাও নেই।
হয়তো শুধু আমাদের কল্পনায়।
অথবা হয়তো মহাবিশ্বের কোনো অদ্ভুত হিসাবের খাতায় তারা এখনও অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
তাই মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, অসম্ভব বলে আমরা যে শব্দটা ব্যবহার করি, সেটা হয়তো আসলে আমাদের অজ্ঞতার আরেকটা নাম।
আমি যদি এখন জানালা খুলে আকাশের দিকে হাত বাড়াই, আমার হাতে কোনো তারা নেমে আসবে না। পদার্থবিজ্ঞান এতটা উদার নয়। মানুষের রোমান্টিক কল্পনার জন্য মহাবিশ্ব তার নিয়ম বদলায় না।
তবু আমি হাত বাড়াতে পারি।
কারণ মানুষ সবসময় ফলাফলের জন্য হাত বাড়ায় না।
কখনো কখনো হাত বাড়ানোটা শুধু এই বিশ্বাসের জন্য যে, পৃথিবীতে এখনও এমন কিছু ঘটতে পারে যা আমরা আগে থেকে জানি না।
তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার ব্যাপারটাও আমার কাছে ঠিক তেমন।
আমি জানি না তুমি কোথায় আছ।
হয়তো এই মুহূর্তে আমার থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে।
হয়তো কয়েক হাজার।
হয়তো এমন কোনো শহরে, যার নাম আমি মানচিত্রে দেখেছি, কিন্তু কখনো যাইনি।
হয়তো তুমি এখন কোনো জানালার পাশে বসে আছ। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। তোমার টেবিলের ওপর অর্ধেক খাওয়া এক কাপ কফি ঠান্ডা হয়ে গেছে। তুমি খেয়াল করোনি।
হয়তো তুমি কোনো বাসে বসে আছ, কানে হেডফোন, জানালার বাইরে দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে শহরের আলো।
হয়তো তুমি কারও সঙ্গে কথা বলছ।
হয়তো একা।
হয়তো তুমি খুব ভালো আছ।
অথবা এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছ, যেটা সম্পর্কে পৃথিবীর কেউ কিছু জানে না।
আমি জানি না।
এই না-জানাটাই অদ্ভুত।
কারণ পৃথিবীতে প্রায় আটশ কোটি মানুষ আছে। আটশ কোটি আলাদা জীবন। আটশ কোটি আলাদা রুটিন। প্রত্যেকের আলাদা রাস্তা, আলাদা ঘর, আলাদা ভয়, আলাদা স্মৃতি।
তার মধ্যে দুজন মানুষের দেখা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কত?
খুব কম।
তবু মানুষ প্রতিদিন দেখা করে।
কেউ বিমানবন্দরে।
কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে।
কেউ ভুল নম্বরে ফোন করে।
কেউ বন্ধুর জন্মদিনে।
কেউ অনলাইনে একটা সাধারণ মন্তব্যের উত্তর দিতে গিয়ে।
আর কেউ হয়তো শুধু রাস্তা পার হওয়ার সময় একবার চোখ তুলে তাকায়।
এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো ঘটার মুহূর্তে কেউ বুঝতে পারে না তারা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম দেখা প্রায় কখনোই সিনেমার মতো হয় না।
কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজে না।
সময় ধীরে চলে না।
আকাশ থেকে পাতা ঝরে না।
বেশিরভাগ সময় ঘটনাটা এত সাধারণ যে আমরা তার গুরুত্বই বুঝি না।
একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে দেখে।
দু-একটা কথা বলে।
তারপর বাড়ি ফিরে যায়।
কিন্তু কয়েক বছর পর সেই মানুষটাই হয়তো একটা পুরোনো সন্ধ্যা মনে করে ভাবে,
“অদ্ভুত। যদি সেদিন আমি সেখানে না যেতাম?”
এই ‘যদি’ শব্দটার ভেতরেই সম্ভবত মানুষের সবচেয়ে বড় রহস্য থাকে।
যদি পাঁচ মিনিট আগে বের হতাম?
যদি অন্য রাস্তা নিতাম?
যদি মেসেজটার উত্তর না দিতাম?
যদি সেদিন বৃষ্টি না হতো?
যদি সেই চেয়ারটা খালি না থাকত?
একটা জীবনের গতিপথ বদলে দিতে অনেক সময় বড় কোনো ঘটনা লাগে না।
লাগে পাঁচ মিনিট।
একটা ভুল রাস্তা।
একটা হঠাৎ সিদ্ধান্ত।
একটা ছোট্ট “হ্যালো।”
তাই তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার জন্য আমার কোনো অলৌকিক ঘটনার প্রয়োজন নেই।
আমার দরকার শুধু অসংখ্য ছোট ঘটনার সঠিক ক্রম।
একদিন হয়তো আমি কোনো জায়গায় যেতে চাইব না, তবু যাব।
তুমিও হয়তো সেদিন বাড়িতে থাকতে চাইবে, কিন্তু কোনো কারণে বের হবে।
আমি হয়তো স্বাভাবিক রাস্তা ছেড়ে অন্য রাস্তা নেব।
তুমি হয়তো কয়েক মিনিট দেরি করবে।
তারপর আমাদের দুজনের এতদিনের আলাদা আলাদা জীবন এক জায়গায় এসে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ছেদ করবে।
হয়তো আমরা কথা বলব না।
এটাও সম্ভব।
হয়তো তুমি আমার পাশ দিয়ে চলে যাবে।
আমি তাকাবই না।
মানুষের জীবনে কত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ এভাবেই হারিয়ে যায়, সেটা আমরা কোনোদিন জানতে পারি না।
সম্ভবত প্রতিদিনই আমরা এমন কারও পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, যার সঙ্গে পরিচয় হলে আমাদের জীবন অন্যরকম হতে পারত।
এই চিন্তাটা একটু নিষ্ঠুর।
আবার সুন্দরও।
কারণ তার মানে সম্ভাবনা কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না।
যতক্ষণ আমরা বেঁচে আছি, ততক্ষণ গল্পের মধ্যে নতুন চরিত্র ঢোকার দরজা খোলা থাকে।
আজ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে দেখা হয়নি মানেই কখনো হবে না, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো কারণ নেই।
পৃথিবী খুব বড়।
কিন্তু মানুষের পথ আশ্চর্যজনকভাবে বারবার একে অন্যকে ছুঁয়ে যায়।
হয়তো একদিন গভীর রাতে শহরের কোনো রাস্তায় বিদ্যুৎ চলে যাবে।
রাস্তার বাতিগুলো একসঙ্গে নিভে যাবে।
যে শহর কখনো পুরোপুরি অন্ধকার হয় না, কয়েক সেকেন্ডের জন্য সত্যিকারের অন্ধকার হয়ে যাবে।
মানুষ ফোনের আলো জ্বালাবে।
দোকানদার বিরক্ত হয়ে জেনারেটর চালানোর চেষ্টা করবে।
কোনো গাড়ির হর্ন বাজবে দূরে।
আমি হয়তো ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকব।
আর ঠিক তখনই টের পাব, পাশে আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে।
তুমি।
কোনো নাটকীয় পরিচয় হবে না।
আমি হয়তো শুধু বলব,
“বিদ্যুৎ গেল?”
তুমি বলবে,
“মনে হয়।”
অবিশ্বাস্য রকম সাধারণ দুইটা বাক্য।
মহাবিশ্ব সম্ভবত আমাদের নিয়ে এর চেয়ে বেশি আয়োজন করবে না। এত বড় মহাবিশ্বের আরও কাজ আছে।
তারপর আলো ফিরে আসবে।
প্রথমবার তোমার মুখ দেখব।
হয়তো সেই মুহূর্তেও বুঝব না কী ঘটেছে।
কারণ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো প্রায়ই নিজেদের পরিচয় দেয় না।
তারা চুপচাপ আসে।
আমাদের জীবনের ভেতর ঢুকে বসে থাকে।
অনেক পরে আমরা বুঝতে পারি, ওই কয়েক সেকেন্ডের আগে আর পরে আমাদের জীবন এক ছিল না।
অথবা হয়তো কিছুই হবে না।
আমরা দুই দিকে চলে যাব।
কখনো আর দেখা হবে না।
সেটাও একটা সম্ভাবনা।
জীবন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় না।
পদার্থবিজ্ঞানও না।
মহাবিশ্ব আমাদের ইচ্ছার প্রতি বিশেষ পক্ষপাত দেখায় বলে কোনো প্রমাণ নেই।
কিন্তু তাতে আশার মূল্য কমে যায় না।
কারণ আশা মানে নিশ্চিত হওয়া নয়।
আশা মানে হলো, নিশ্চিত না হয়েও দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ না করা।
তাই আমি বলব না আমাদের দেখা হবেই।
সেটা বললে কথাটা সুন্দর হতে পারে, কিন্তু সত্য হবে না।
আমি বরং বলব,
আমাদের দেখা হতে পারে।
এই ছোট্ট ‘পারে’ শব্দটাই আমার কাছে যথেষ্ট।
কারণ পৃথিবীতে যত প্রেম, যত বন্ধুত্ব, যত গল্প তৈরি হয়েছে, সবকিছুর শুরুতেই একসময় শুধু এই শব্দটা ছিল।
হতে পারে।
হয়তো।
সম্ভব।
তারপর কোনো একদিন সম্ভাবনাটা ঘটনা হয়ে গেছে।
তাই কোনো এক রাতে আমি আবার আকাশের দিকে তাকাব।
হয়তো সেখানে তারা থাকবে।
হয়তো থাকবে না।
আমি হাত বাড়াব না, কারণ জানি তারা আমার হাতে নেমে আসবে না।
কিন্তু শহরের দিকে তাকাব।
হাজার জানালার আলো।
হাজার রাস্তা।
লাখ মানুষের চলাচল।
আর ভাবব,
এই বিশাল বিশৃঙ্খলার কোথাও তুমি আছ।
আমিও আছি।
দুজনের জীবন এখনও আলাদা পথে চলছে।
কিন্তু সামনে কত রাস্তা বাকি, সেটা আমরা কেউ জানি না।
কোন মোড়ে তারা এক হবে, সেটাও না।
তাই এখনই তোমার সঙ্গে দেখা না হওয়ার মধ্যে কোনো দুঃখ নেই।
বরং একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে।
কারণ আমাদের গল্প যদি সত্যিই কোথাও শুরু হওয়ার অপেক্ষায় থাকে, তাহলে এই মুহূর্তে আমরা দুজনেই সেই গল্পের আগের অধ্যায়ে আছি।
যেখানে কেউ কাউকে এখনও চেনে না।
কেউ জানে না সামনে কী আছে।
শুধু অসংখ্য সম্ভাবনা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।
আর তাদের মধ্যে কোথাও, খুব সাধারণ একটা সম্ভাবনা হয়তো চুপচাপ অপেক্ষা করছে।
কোনো এক রাতের জন্য।
কোনো এক রাস্তার জন্য।
কয়েক সেকেন্ডের অন্ধকারের জন্য।
আর তোমার পাশে আমার দাঁড়িয়ে পড়ার জন্য।
Comments (0)
Log in to leave a comment.
No comments yet
Be the first to share your thoughts