যে জোছনা দেখার জন্য আমি থাকব না, সেই জোছনাও একদিন ঠিকই আসবে।
46-August 25, 2026-4 min read

পৃথিবীতে আবার ফিনিক ফোটা জোছনা আসবে। শ্রাবণ মাসে টিনের চালে বৃষ্টির সেতার বাজবে। রাতের কোনো নিঃসঙ্গ জানালায় কেউ হয়তো চুপ করে বসে সেই শব্দ শুনবে। কোথাও কদম ফুটবে, কোথাও ভেজা মাটির গন্ধ উঠবে, কোথাও দুটি মানুষ প্রথমবারের মতো একে অপরের হাত ধরবে।
শুধু আমি থাকব না।
কথাটা ভাবলে প্রথমে একটু অদ্ভুত লাগে। কারণ মানুষ জন্মের পর থেকে এমনভাবে পৃথিবীকে দেখতে শেখে, যেন পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনাই somehow তাকে কেন্দ্র করে ঘটছে। সকাল হয়েছে মানে আমার সকাল হয়েছে। বৃষ্টি পড়ছে মানে আমি বৃষ্টি দেখছি। শীত এসেছে মানে আমার গায়ে ঠান্ডা লাগছে।
আমাদের সমস্ত অভিজ্ঞতার কেন্দ্রে আমরা নিজেরাই।
তাই হয়তো নিজের অনুপস্থিতির পৃথিবী কল্পনা করা এত কঠিন।
আমি নেই, অথচ আকাশ আছে।
আমি নেই, অথচ শহরের রাস্তায় গাড়ি চলছে।
আমি নেই, অথচ কোনো বাড়ির ছাদে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে প্রথম প্রেমের মানুষটির সঙ্গে ফোনে কথা বলছে।
আমি নেই, অথচ আমার খুব পছন্দের কোনো গান অন্য কেউ প্রথমবার শুনছে।
ব্যাপারটা নিষ্ঠুর।
আবার অদ্ভুত সুন্দরও।
মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি সম্ভবত এই ধারণা যে, কোনো সুন্দর মুহূর্তের সাক্ষী না থাকলে সেই সৌন্দর্যের বুঝি কোনো মূল্য থাকে না। আমরা সূর্যাস্তের ছবি তুলি, সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও করি, পাহাড়ের চূড়ায় উঠে প্রমাণ রেখে আসি, আমি এখানে ছিলাম।
যেন পৃথিবীকে সাক্ষী রেখে যেতে হবে যে আমিও একদিন এই দৃশ্যের অংশ ছিলাম।
কিন্তু কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে সূর্য উঠেছে যখন কোনো মানুষ তা দেখেনি। সমুদ্রের ঢেউ ভেঙেছে এমন সব তীরে যেখানে কোনো পদচিহ্ন ছিল না। বনের ভেতর ফুল ফুটেছে, শুকিয়ে ঝরে গেছে, তার গন্ধ নেওয়ার জন্যও কেউ ছিল না।
তবু তারা ফুটেছিল।
সৌন্দর্য কখনো দর্শকের অনুমতি নিয়ে আসে না।
এই কথাটা বুঝতে পারলে মৃত্যুকে নিয়ে আমাদের ভয়টা হয়তো একটু অন্যরকম হয়ে যায়।
আমরা মৃত্যুকে শুধু জীবন শেষ হয়ে যাওয়া হিসেবে দেখি না। মৃত্যুর ভেতরে আরেকটা গোপন কষ্ট আছে। সেটি হলো, ভবিষ্যৎ থেকে বাদ পড়ে যাওয়া।
আমি জানতে পারব না একশ বছর পর পৃথিবী কেমন হবে।
আমি দেখতে পারব না ভবিষ্যতের শহরগুলো।
যে বইগুলো এখনও লেখা হয়নি, সেগুলো পড়তে পারব না।
যে গানগুলো এখনও তৈরি হয়নি, সেগুলো শুনতে পারব না।
আমার মৃত্যুর পর কোনো শ্রাবণের গভীর রাতে হয়তো এমন বৃষ্টি হবে, যার শব্দ শুনলে আমার খুব ভালো লাগত।
কিন্তু আমি জানবই না সেই রাতটি কখন এসেছিল।
মানুষ সম্ভবত মৃত্যুর চেয়ে এই হারিয়ে ফেলা ভবিষ্যৎকেই বেশি ভয় পায়।
আমরা চলে যাব, অথচ গল্পটা চলতে থাকবে।
একটা সিনেমা মাঝপথে ছেড়ে উঠে যাওয়ার মতো।
শেষটা কী হলো, জানা হবে না।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ঠিক এই কারণেই বর্তমানের মূল্য এত বেশি।
কারণ কোনো একদিন সত্যিই এমন একটা বর্ষা আসবে, যেটি আমার জন্য নয়।
তাহলে আজ যে বৃষ্টি আমি শুনতে পাচ্ছি, সেটাকে এত অবহেলা কেন?
কোনো একদিন এমন পূর্ণিমা উঠবে, যেদিন আমি আকাশের দিকে তাকাতে পারব না।
তাহলে আজকের চাঁদটাকে না দেখে সারারাত মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা এত জরুরি কেন?
কোনো একদিন আমার পরিচিত মানুষগুলো আমাকে ছাড়াই কথা বলবে, হাসবে, খাবে, ঘুরতে যাবে। ধীরে ধীরে তাদের কথাবার্তায় আমার নাম কমে যাবে। কয়েক দশক পরে হয়তো এমন মানুষ পৃথিবীতে থাকবে, যারা জানবেই না আমি কখনো ছিলাম।
এটাই স্বাভাবিক।
আমাদের আগে অসংখ্য মানুষ পৃথিবীতে এসেছিল। তাদেরও ভয় ছিল, স্বপ্ন ছিল, পছন্দের খাবার ছিল, প্রিয় মানুষ ছিল। কোনো এক বিকেলে তারাও হয়তো ভেবেছিল তাদের জীবন ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।
আজ তাদের অধিকাংশের নামটুকুও আমরা জানি না।
একদিন আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হবে।
শুনতে বিষণ্ণ লাগলেও এর ভেতরে একধরনের মুক্তি আছে।
যদি একদিন সবকিছুই পিছনে পড়ে যায়, তাহলে প্রতিটি ছোট ভুল নিয়ে এত ভয় পাওয়ার কী আছে?
কে আমাকে অপছন্দ করল, কে আমার সম্পর্কে কী ভাবল, কোন কথাটা বলা উচিত ছিল না, কোন জায়গায় আমি একটু বোকামি করে ফেললাম, এসব নিয়ে আমরা নিজেদের জীবনের কতটা সময় নষ্ট করি।
অথচ মহাবিশ্ব এ বিষয়ে আশ্চর্যরকম উদাসীন।
আমাদের ব্যর্থতার দিনেও সূর্য ঠিক সময়ে অস্ত যায়।
হৃদয় ভাঙার রাতেও চাঁদ ওঠে।
কেউ চলে গেলে পরদিন সকালে চায়ের দোকান খোলে।
পৃথিবী নিষ্ঠুর বলেই এমন নয়।
পৃথিবীর নিয়মটাই এমন।
সে কাউকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি।
আর সম্ভবত এই সত্যটি মেনে নেওয়ার পরই মানুষ প্রথমবার সত্যিকারের বাঁচতে শেখে।
আমরা পৃথিবীর মালিক নই।
আমরা অতিথি।
কয়েক দশকের জন্য এসেছি। কিছু সকাল দেখব, কিছু বর্ষা পাব, কয়েকজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হবে। কারও জীবনে হয়তো সামান্য আলো রেখে যাব। তারপর একদিন কোনো ঘোষণা ছাড়াই আমাদের অংশটুকু শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু পৃথিবী থামবে না।
তারপরও ফিনিক ফোটা জোছনা নামবে।
শ্রাবণ আসবে।
টিনের চালে বৃষ্টি পড়বে।
কোনো শিশু প্রথমবার সেই শব্দ শুনে আনন্দে জানালার কাছে ছুটে যাবে। কোনো বৃদ্ধ মানুষ হয়তো সেই বৃষ্টির শব্দে পঞ্চাশ বছর আগের একটি মুখ মনে করবে। কোনো প্রেমিক তার প্রিয় মানুষটিকে বলবে, “শোনো, কী সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে।”
সেই অলৌকিক সঙ্গীত শোনার জন্য আমরা থাকব না।
কিন্তু আজকের সঙ্গীতটা তো এখনও বাজছে।
সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটুকুই:
আমাদের কাজ পৃথিবীকে চিরকাল ধরে রাখা নয়।
আমাদের কাজ, যতক্ষণ এখানে আছি, ততক্ষণ একটু মন দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখা।
Comments (1)
Log in to leave a comment.
Just wow 😲😲